Logo

সেক্যুলার ধর্মই হলো ইসলামের সাথে সন্ত্রাসজঙ্গীপনা করা

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
"সেক্যুলার ধর্মই হলো ইসলামের সাথে সন্ত্রাসজঙ্গীপনা করা"

শাইখ মুহাম্মাদ আতিফ আফেন্দি: ফেজটুপির এক তুর্কি শহিদের গল্প।  ৩ মার্চ, ১৯২৪ সাল।
মুসতাফা কামাল আতাতুর্ক উসমানি খিলাফাহর চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটান। সেই সাথে তুরষ্ককে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত করার পাঁয়তারায় সবধরণের ইসলামি রীতি-নীতি ও নিদর্শনকে নিষিদ্ধ করে ফেলেন।

তিনি আজান নিষিদ্ধ করেন, দীনি মাদরাসা বন্ধ করে দেন, বোরখা নিষিদ্ধ করেন, আরবি হরফের উসমানি অক্ষরের স্থলে ল্যাটিন অক্ষর চালু করেন, শরিআহ আদালত বন্ধ করে দেন, আয়া সোফিয়া মসজিদকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করেন, ইসলামি সংবিধানের পরিবর্তে পশ্চিমা কুফরি সংবিধান চালু করেন। এছাড়া আরও অনেক ইসলামবিরোধী আইন জারি করেন।

তিনি পাগড়ি ও ফেজটুপি নিষিদ্ধ করে, পশ্চিমা ক্যাপ ও স্যুট পরার আইন জারি করেন। এমনকী তিনি এই ঘোষণাও দেন- যেহেতু আমরা একটি সভ্য জাতি হওয়ার ইচ্ছা রাখি, সেহেতু আমাদেরকে সভ্যদের রাষ্ট্রীয় পোষাকের অনুসরণ করতে হবে। ফেজটুপি হলো মুর্খদের নিদর্শন!

ইসলামপ্রিয় তুর্কি জাতি তার এই ইউরোপীয় সভ্যতার আমদানি দিলখুশভাবে মেনে নিতে পারেনি; এ সভ্যতার প্রতি তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। কেননা, প্রায় ছয়শ বছর উসমানি খিলাফাহর ছায়াতলে থেকে ইসলামি নিদর্শন তাদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়ে আছে।

এই আইন অমান্য করলে শাস্তির আদেশ জারি করলেন আতাতুর্ক। আইন জারি করার দুদিন পর তার পেটোয়া তুর্কি পুলিশ তুরষ্কের রাস্তায় রাস্তায় চক্কর দিতে থাকে, আর তুর্কিদের মাথা থেকে ফেজটুপি ছিনিয়ে নিতে শুরু করে। তারপরও কাজ না হওয়ায় আতাতুর্ক তুরষ্কের প্রতিটি প্রদেশে জরুরি আদালত স্থাপন করলেন এই মর্মে- আদালত বিরুদ্ধাচরণকারীদেরকে শায়েস্তা করতে পারবে। জেল, ফাঁসি, গুলি করে হত্যা করতে পারবে।

১৯২৫ সালে আতাতুর্ক পশ্চিমা ক্যাপ পরার আইন প্রণয়ন করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক উলামায়ে কিরামকে গ্রেফতার করেছিল তুর্কি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের সর্বাগ্রে ছিলেন প্রসিদ্ধ তুর্কি আলেম- শাইখ মুহাম্মদ আতিফ আফেন্দি। কারণ, এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি পশ্চিমা বেশভূষা ও চাল-চলন হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন।

২৬ জানুয়ারি, ১৯২৬ সাল।

শাইখ আতিফ আফেন্দিকে প্রথমবারের জন্য জরুরি আদালতে হাজির করা হয়। তার অপরাধ- তিনিই প্রথম তুর্কি; যিনি পশ্চিমা ক্যাপের বিরুদ্ধাচরণ করে কিতাব লিখেছেন! এই অপরাধ অমার্জনীয়; ছাড় দেওয়া যায় না! আবার ২১ জানুয়ারি তুরষ্কের ‘গেরাসন’ শহরে তুর্কিরা ইউরোপীয় ক্যাপের বিরুদ্ধে একটি সফল বিপ্লব কায়েম করে ফেলেছিল।

যা ‘ক্যাপ বিপ্লব’ বলে তুরস্কে পরিচিত। ওই বিপ্লবের পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে শাইখ মুহাম্মদ আতিফ আফেন্দির লিখিত- তাকলিদুল ফারানজাহ ওয়াল কুব্বা’আহ নামক সাড়াজাগানো কিতাবটি। এ কিতাবেই শাইখ আফেন্দি ক্যাপ হারাম হওয়ার ফতোয়া প্রদান করেছিলেন।

শাইখ আতিফ আফেন্দিকে কাঠগড়ায় উপস্থিত করা হলো। রাষ্ট্রপক্ষ বাদী হয়ে তাঁর তিনবছরের জেল তলব করল। বিচারিক তুমুল বাকবিতণ্ডার পর বিচারপতি তাঁকে নিজ ভুল স্বীকার করে আত্নরক্ষার পত্র লিখে পরদিন আদালতে জমা দেওয়ার আদেশ দিলেন।

শাইখ আফেন্দি প্রথমে আত্নরক্ষার পত্র লিখলেন। কিন্তু পরে সেটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন! পরদিন যথাসময়ে আদালতে বিচার কায়েম হলো। বিচারক তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
-আপনার আত্মরক্ষামূলক পত্র কই?
-মহোদয়! আমি কোনো ভুল করিনি যে, আত্নরক্ষামূলক পত্র লিখব!
-ওর্ডার! ওর্ডার! এই আসামিকে ফাঁসির মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হলো।

উস্তাদ নজিব ফাজিল তাঁর রচিত কিতাব- সালিফ আজ-জিকর এর মধ্যে বলেন- শাইখ তাহির মওলবি, যিনি ওই আদালতের একজন আসামী ছিলেন; তিনি ১৯৩২ সনে আমায় বলেছেন- ইশার সালাতের পর শাইখ মুহাম্মদ আতিফ আফেন্দি বিচারপতির আদেশানুসারে ভুল স্বীকার করে আত্নরক্ষামূলক পত্র লিখতে বসলেন। সামান্য কিছু লিখার পর তাঁর ঝিমুনি চলে এলো।

উস্তাদ নজিব ফাজিল বলে যেতে থাকলেন- শাইখ আফেন্দি পত্রখানা হাতে নিয়েই ঘুমোতে লাগলেন। অথচ, তিনি দীর্ঘদিন চোখের পাতা এক করেননি! কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর হঠাৎ তিনি চোখ খুললেন! তাঁর চেহারায় হাসিখুশিভাব আর আশ্চর্যদায়ক ভাব দেখা গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম :

-কী হয়েছে শাইখ, আপনি এতো তাড়াতাড়ি জেগে পড়লেন কেন?
-ঘুমের দ্বারা যে উদ্দেশ্য ছিল, তা অর্জিত হয়ে গেছে। আমি যে স্বপ্নের অপেক্ষা করছিলাম, তা এই মুহূর্তে দেখে ফেলেছি!
-কী দেখেছেন শাইখ?
-আমি দুজাহানের সরদার হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, তিনি আমাকে বলছেন- হে আতিফ! তুমি কি আত্নরক্ষার পত্র লিখতে ব্যস্ত? তুমি কি আমার মুলাকাত চাও না?
-স্বপ্নের কী ব্যাখ্যা করছেন শাইখ?
-কামালের লোকেরা অচিরেই আমায় ফাঁসি দেবে, এবং আমি আমার পেয়ারা হাবিবের মুলাকাত করব।

শাইখ তাহির মওলবি বলেন- পরদিনই আদালত তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে তড়িৎ ফাঁসি কার্যকরের আদেশ প্রদান করে। পরদিন ভোরে শাইখ মুহাম্মাদ আতিফ আফেন্দিকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে শাহাদাতের শিরিব শরাব পান করে নেন!

সূত্র : তুরষ্কের অনলাইন আরবি নিউজপোর্টাল- তুর্কপ্রেস ডট কম এ- ০৩/০৩/২০১৬ সালে প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে।
✍️ আইনুল হক কাসেমী

সংবাদটি শেয়ার করুন


এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Theme Created By Tarunkantho.Com