Logo

রোজার বিধান যুগে যুগে

মাওলানা ইলিয়াছ জাবের 
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১
রোজার বিধান যুগে যুগে

ধর্মীয় পবিত্রতা আর গাম্ভির্য নিয়ে শুরু হচ্ছে রমজান। রোজার চাঁদ  উঠলেই শুরু হবে রমজান। এ এক ভিন্ন অনুভূতি। রমজান আমাদের জীবনে এক নতুন বার্তা নিয়ে আসে। নিয়ে আসে এক অপার্থিব শিক্ষা। ইসলামে এর বিধান বছরে একমাস। আরবি মাসের নমব মাস রমজানুল মোবারক। যখনই এ মাসের চাঁদ উঠে। সুস্থ, মুকিম (নিজ বাড়িতে অবস্থানকারী) ও প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান এ মাসে রোজা রাখবে। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে-
“রমজান এমন মাস। যে মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল করা হয়েছে। এটি মানুষের জন্যে হেদায়াত ও সুপথের যাত্রীদের জন্যে স্পষ্ট পথনির্দেশ। ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্যকারী। কাজেই তোমাদের যে এ মাস পাবে এতে যেনো সে রোজা রাখে।” [বাকারা: ১৮৫]
 

রোজার বিধান সবার জন্যে

ইসলামের পাঁচ ভিত্তির চতুর্থ ভিত্তি রোজা। আল্লাহ দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মোহাম্মদির জন্যে রোজা ফরজ করেছেন। তবে এ রোজা শুধু আমাদের জন্যেই নয়। এ বিধান ছিলো আগের উম্মতের জন্যও। হজরত আদম (আ.) থেকে যতো নবি এ ধরাতে এসেছেন। তাদের ও তাদের উম্মতের জন্যে ছিলো রোজার বিধান। উম্মতে মোহাম্মাদিকে রোজার বিধান দিয়ে আল্লাহ কোরআনে বলেন-
“মোমিনরা! তোমাদের জন্যে সিয়ামের বিধান দেয়া হলো। যেমন দেয়া হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যেও। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পারো।” [বাকারা: ১৮৩]
 
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি (রহ.) তার বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ রুহুল মায়ানিতে লিখেন, ‘যেমন দেয়া হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যেও’ এ কথা বলে হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত আগত সব মানুষকে বোঝানো হয়েছে।
 
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, ‘রোজার হুকুম হজরত আদম (আ.) এর যুগ থেকে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর যুগ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে। [ফাওয়ায়েদে উসমানী]
 
তবে হজরত আদম (আ.) এর সময় রোজার ধরণ কেমন ছিলো তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির (রহ.) তার বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ তাফসিরে ইবনে কাসিরে লিখেন, ‘ইসলামের প্রাথমিকযুগে প্রতিমাসে তিনটি রোজা রাখার বিধান ছিলো। রমজানের রোজা ফরজ হলে তা বাতিল হয়ে যায়।’
 
তাফসিরে রুহুল মায়ানিতে ‘যেমন দেয়া হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যেও’ বলে যে তুলনা করা হয়েছে তা শুধু ফরজ হওয়ার ব্যাপারে প্রযুজ্য। নিয়ম বা সময় হিসেবেও এ তুলনা হতে পারে। কিতাবধারী ইহুদিদের উপরও রোজা ফরজ ছিলো। তারা এ বিধান না মেনে ফেরাউন যেদিন নীলনদে ডুবে মরেছিলো। শুধু সেদিনটিতেই রোজা রাখতো। খ্রিস্টানরাও এর আগে-পরে দুদিন যোগ করে রোজা রাখতো। এভাবে রোজার সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে তারা পঞ্চাশে পৌঁছায়। গরমে রোজা রাখতে কষ্ট হবে মনে করে গরমের রোজা তারা শীতেরদিনে রাখতো। 
 
এ বিষয়ে প্রমাণও আছে। হরজত ইবনে মোগাফ্ফাল ইবনে হানজালা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুল (সা.) বর্ণনা করেন, খ্রিস্টানদের জন্যে একমাস রোজা রাখা ফরজ ছিলো। তাদের এক বাদশাহ একবার অসুস্থ হয়ে পড়লো। তারা মান্নত করলো, বাদশা সুস্থ হলে তারা ১০দিন বেশি রোজা রাখবে। এরপরের বাদশা অসুস্থ হলে তারা এর সুস্থতার জন্যেও আরো ৭টি রোজা বাড়িয়ে দেয়ার মান্নত করলো। এরপরের বাদশা বললেন, তিনদিন আর বাদ দিয়ে লাভ কী? এসো ৫০টিই পুরো করে এ রোজাগুলো বসন্তকালে পালন করি।
 
ইহুদিদের রোজা বিষয়ে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) মদিনায় এলে আশুরার দিন ইহুদিদের রোজা রাখতে দেখেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বললো, ‘এটি উত্তম দিন। এ দিনে মহান আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে শত্রুর কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। এ দিনে হজরত মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। তাই আমরাও এ দিনে রোজা রাখি।’ রাসুল (সা.) বললেন, আমি তোমাদের চেয়ে মুসা (আ.) এর ব্যাপারে অধিক হকদার। এরপর তিনি এ দিনে মুসলমানদের রোজা রাখতে আদেশ দেন। ইহুদিদের সাথে যাতে না মেলে এ জন্যে এর আগে বা পরে একটি রোজা মিলিয়ে রাখতে আদেশ দেন। [সহিহ বোখারি]
 
এতে প্রমাণ হলো, হজরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই রোজার বিধান চলে আসছে। কিন্তু লোকেরা অন্যান্য বিধানের মতো রোজার বিধানেও নিজেদেরর খেয়াল খুশি জুড়ে দিয়ে এতে পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে রোজার ধর্মীয় তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট নষ্ট হয়ে যায়। হয়ে যায় নিছক এক প্রথা। যা রোজার উদ্দেশ্য নয় মোটেও। এখান থেকে এর ধারা পরিবর্তন করে রোজাকে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম বানিয়ে দ্বিতীয় হিজরিতে আল্লাহ উম্মতের মোহাম্মদির জন্যে রোজা ফরজ করে দেন। ঘোষণা করেন-
 
“মোমিনরা! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমনটি করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মোত্তাকি হতে পারো। এ বিধান নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্যে। তোমরা অসুস্থ হলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময়ে রোজার সংখ্যা পূরণ করে নেবে। যাদের জন্যে রোজা রাখা কষ্টকর তারা এর বিনিময়ে ফিদিয়া দিয়ে দেবে। একজন মিসকিনকে খাবার দিয়ে। যদি তোমরা রোজা রাখো তবে তা তোমাদের জন্যে হবে অতি কল্যাণকর। যদি তোমরা তা বুঝতে।” [সুরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৩-১৮৪]
ইসলাম অন্য বিধানের মতোই রোজাকেও স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ বানিয়েছে। অন্য ধর্মে রোজা বা উপবাস একটি কষ্টসাধ্য বিষয়। কোনো কোনো ধর্মাবলম্মীরাতো এতে এতো বাড়াবাড়ি করেছে। টানা চল্লিশদিন কোনো কিছু না খেয়ে থাকাই রোজা বা উপবাস মনে করতো। 
 
অনেকে আবার গোশতজাত খাবার না খাওয়াকেই রোজা মনে করতো। হদিদের মতে রোজা ছিলো বেদনা ও শোকের প্রতীক। তারা শুধু ইফতারির সময় খাবার খেতো। আর কিছুই খেতো না। ফলে সারারাত তাদের সবকিছু থেকে বিরত থাকতে হতো। কিন্তু ইসলাম এসব কিছুর মধ্যে ভারসাম্য বিধান করেছে। মানুষের যাতে কষ্ট না হয় সেদিকে যেমন খেয়াল করেছে। 
 
আবার অধিক খেয়ে রোজার উদ্দেশ্য যাতে নষ্ট না হয় সেদিও সজাগ থেকেছে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখতে আদেশ দিয়েছে। সারারাত দিনে করা যায়নি এমন সবকিছু বৈধ করে দিয়েছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে রোজা রাখার তাওফিক দান করুন! আমিন!!
সংবাদটি শেয়ার করুন


এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Theme Created By Tarunkantho.Com