Logo

রক্তাক্ত একুশের গর্বিত ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
রক্তাক্ত একুশের গর্বিত ইতিহাস

আতিকুর রহমান রবিউল:  দেশের জন্য রক্ত দেয়ার ইতিহাস অনেক আছে, ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে বাঙালিরা আজ স্মরণীয় সবার কাছে। পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে জানা যায় অনেক দেশের নাগরিক তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শত্রুর মোকাবেলা করতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত বিলিয়েছে।

কিন্তু মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে কেউ বুকের তাজা রক্ত বিলিয়েছেন এমন ইতিহাস খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীতে বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্র ভাষায় পরিণত করেছি। দেশ দখলের ইতিহাস অনেক আছে। একটা দেশকে কাবু করে সেদেশের অর্থ-বিত্ত সম্পদ লুট করার ইতিহাস অনেক রয়েছে। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশের মানুষের মায়ের ভাষা মাতৃভাষা বাংলার জন্য এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে হয়তো কখনোই কেউ ভাবেনি। হায়েনার দলেরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল কিন্তু বাঙলীরা তো দমে থাকার জাতি নয়। সঠিক নেতৃত্বের বলে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করতে সক্ষম হয়েছি ।

কিন্তু সেই দিনটা কোন মধুর ঘটনায় অর্জিত হয়নি। অর্জিত হয়েছে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো নাম না জানা অনেক ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত কাহিনী আজও বাঙালির মনে দাগ কেটে আছে। বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারীতে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার হয়তো আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু সেই দিন চলে যাওয়া কিছু বীর আমাদের মনে জায়গা করে আছে, থাকবে অনন্তকাল।

ইয়াহিয়া, ভুট্টোর মত এমন নির্মম পাষণ্ড ব্যক্তি কখনোই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় বার জন্ম নিবে না। যারা কিনা জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়। বর্বর পাকিস্তানিরা চেয়েছিল উর্দু তাকেই আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেবে। কিন্তু তারা জানত না আমার দেশে জন্ম নেয়া বীর বাহাদুরেরা কখনোই তা সহজভাবে মেনে নিবে না।

নিজ ভাষা রক্ষার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিছিল-মিটিং জনসমাবেশ সংঘটিত হতে থাকে। কিন্তু হায়েনাদের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচতে পারেনি আমাদের ভাইদের প্রাণ। সেদিন মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকে রক্ষার্থে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল আমাদের কিছু ছাত্র জনতা। যাদের আত্মত্যাগে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম আমাদের প্রাণের ভাষা, বাংলা ভাষা। অবশেষে লড়াই সংগ্রাম করে ১৯৭১ দেশ ভাগাভাগি হয়ে যায়। আরো একটি রক্তাক্ত ইতিহাস সৃষ্টি হয়।

৩০ লক্ষ শহীদের এবং ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার বহু বছর পরে আমাদের ভাষার সম্মান রক্ষার্থে জাতিসংঘ সাধারন পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু এত সহজ ছিল না আমাদের মাতৃভাষাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য। তার জন্য লড়াই করতে হয়েছে বিভিন্ন স্তরে।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা স্বীকৃতি অর্জনের জন্য পাঁচটি জাতিসংঘের সদস্য দেশের পরামর্শ অনুযায়ী ২৯ টি দেশের সমর্থনে কাজ চালিয়ে যায় ‘আনা মারিয়া’ এবং জোসেফের পরামর্শে ১৯৯৯ সালে।

অবশেষে ক্যানাডা, ভারত,  ফিনল্যান্ড হাঙ্গেরি এবং বাংলাদেশ সহ  পাঁচটি দেশ প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। সকল চড়াই-উতরাই পার করে ১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। যার সাথে বিশ্বের ১৮৮টি দেশ একাত্মতা ঘোষণা করে একুশে ফেব্রুয়ারি “আন্তর্জাতিক  মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে। যা ২০০০ সালের  একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের সদস্য দেশ সমূহে একসঙ্গে পালিত হচ্ছে।

২০১০ সালের একুশে অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেব পালন করবে জাতিসংঘ সর্বসম্মতিক্রমে এমন ঘোষণা প্রদান করেন। ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ, এমন কঠিন সংগ্রাম হয়তো পৃথিবীর কোন জাতি আর করেনি। পৃথিবীর ইতিহাসে নজির হয়ে থাকল বাংলা ভাষার ইতিহাস। আমরা জাতি হিসেবে আজ গর্বিত। সারা বিশ্বে আমাদের সম্মান আমাদের ভাষা সৈনিকদের সম্মান অক্ষয় হয়ে থাকবে চিরকাল।

মনের গভীর থেকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকবে সেই সকল শহীদদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের মাতৃভাষা আজ বিশ্বদরবারে সুপরিচিত। যাকে আজ বলা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। নিজের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষার স্থান পেল সবার উপরে। তাই গর্ব করে বলতে পারি আমরা বাঙালি গর্বিত জাতি। শ্রদ্ধা এবং সম্মান অমর একুশের সকল ভাষা সৈনিকদের। যাদের আত্মত্যাগে আমরা আজ আমাদের মাতৃভাষায় সগৌরবে কথা বলতে পারছি। চির অমর হয়ে থাক আমাদের ভাষা সৈনিকেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন


এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Theme Created By Tarunkantho.Com