Thursday , December 9 2021

মাওলানা ‘আব্দুল হামীদ’ পীর সাহেব মধুপুর এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

নাম: আবদুল হামীদ (যিনি পীর সাহেব মধুপুর নামে অধিক পরিচিত)

তিনি একজন বাংলাদেশি দেওবন্দি আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। খতমে নবুওয়াত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের মুহতারাম আমীর ও জামি’আ ইসলামিয়া হালীমিয়া মধুপুর-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক।

জন্ম:

বাতিল ও তাগুতী শক্তির মহা আতঙ্ক সত্য কথনে ও কর্মে আপোষহীন, দ্বীনে হক এর ক্লান্তিহীন নিরলস কর্মী রাহবরে শরীয়ত ও তরীকত, পীরে কামেল আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আ. হামীদ (পীর সাহেব মধুপুর) বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে বিক্রমপুরের (মুন্সিগঞ্জ জেলার) সিরাজদিখান থানাধীন রাজানগর সৈয়দপুর ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের এক আদর্শবান সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। হযরতের পিতার নাম জনাব মনোরুদ্দীন সাহেব (রহ.)। বাল্যকাল হতেই তিনি উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। অনর্থক খেলা-ধূলার প্রতি তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না। লেখা পড়ার প্রতি তাঁর ছিল দুরন্ত আকর্ষণ। কিন্তু অল্প বয়সে পিতার ইন্তেকালের কারণে ছাত্র জীবনে তাঁর অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।

শিক্ষা জীবন:

হযরতের প্রাথমিক শিক্ষা নিজ গ্রামের দক্ষিণ মধুপুর শরীয়তুল্লাহ বেপারী মসজিদের মক্তব থেকে আরম্ভ হয়। সেখানে হযরতের উস্তাদ ছিলেন বিশিষ্ট বুযূর্গ হযরত মাওলানা আলী আজম সাহেব (রহ.) ও মুন্সি আঃ কাদের সাহেব (রহ.)। প্রাথমিক শিক্ষার পর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য স্নেহভাজন আলী আজম সাহেব (রহ.) এর রাহবরিতে নোয়াখালীতে অন্তর্গত চাটখিল থানাধীন কেশুরবাগ গ্রামের আশরাফিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে বিশিষ্ট বুযূর্গ হযরত মাওলানা সাঈদুর রহমান সাহেব (রহ.) এর তত্ত্ববধানে সুনামের সাথে চার বছর পড়াশুনার পর সর্বোচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্থানের দেওবন্দী সিলসিলার সুপ্রসিদ্ধ মাদরাসা দারুল উলূম আল হুসাইনিয়া ওলামা বাজার গমন করেন। এবং সেখানে দীর্ঘ ছয় বছর যুগ শ্রেষ্ঠ বুযূর্গ আসাতাযায়ে কেরামের স্নেহের ছায়া-তলে থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস সমাপন করেন।

আসাতাযায়ে কেরামগণ;
হযরতের বিশেষ বিশেষ উস্তাদগন হলেন-

১। হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর প্রথম শ্রেণীর এগার জন খলীফার মধ্যে অন্যতম শাহ্ সূফী নূর বখ্শ শৈশ্যদি (রহ.) এর অন্যতম খলীফা আলেমকূল শীরোমনী হযরতুল আল্লাম আব্দুল হালীম সাহেব (রহ.)। যিনি ওলামা বাজারের বড় হযরত নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
২। কুতবে আলম হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর সর্বপ্রথম খলীফা ও হারদুয়ীর হযরত আবরারুল হক সাহেব (রহ.) এর অন্যতম খলীফা হযরত মাওলানা সৈয়দ আহমদ সাহেব দা:বা: (মুহতামীম ওলামা বাজার মাদ্রাসা)।
৩। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম বহুগ্রন্থ প্রণেতা শাইখুল হাদীস ওয়াল আদব আল্লামা নূরুল ইসলাম (আদীব সাহেব হুজুর ) দা:বা:।
৪। মুফতীয়ে আযম হযরত মুফতী ফয়যুল্লাহ সাহেব (রহ.) এর বিশিষ্ট খলীফা আল্লামা খায়ের মুহাম্মদ মোস্তফা (রহ.)।
৫। মুফতী ফয়যুল্লাহ সাহেব (রহ.) এর বিশিষ্ট শাগরেদ হযরত মাওলানা মকসুদুল্লাহ সাহেব (রহ.)।
৬। মুফতী মুহা: হাসান সাহেব (রহ.) যিনি ওলামা বাজারের হযরত (রহ.) এরও উস্তাদ ছিলেন।

বহির্বিশ্বে গমন ও যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের থেকে উচ্চতর সনদ অর্জন:

হযরত পীর সাহেব হুজুরের বড় কৃতিত্ত্ব হচ্ছে তিনি উচ্চতর সনদ অর্জনের জন্য বহির্বিশ্বেও গমন করেছেন। সে ধারাবাহিকতায় তিনি শাইখুত তাফসীর আল্লামা ইদ্রীস কান্দেহলভী (রহ.) এর কাছ থেকেও তিনি বুখারী শরীফের সনদ অর্জনের সুযোগ লাভে ধন্য হয়েছেন। অনুরূপভাবে হাফেজে হাদীস আব্দুল্লাহ দরখাস্থি (রহ.) যখন তিনি পাঞ্জাবের রহীম খানে মাখজানুল উলূম মাদরাসার ফারেগীন ছাত্রদেরকে তাফসীরের উপর বিশেষ দরস প্রদান করতেন। সে যমানায় মধুপুরের হযরতও সেই দরসে শরীক হয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহনের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

দাওয়াতে তাবলীগের মেহনত:

মানব জাতি হল আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। তন্মধ্যে উম্মতে মুহাম্মাদিয়া হল সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত। এত বড় উচ্চ মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার কারণ আল্লাহ পাক কুরআনে কারীমে এরশাদ করেছেন। তা হল (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা (সূরায়ে আল ইমরান)। মূলত এ দায়িত্ব ছিল আম্বিয়ায়ে কেরামের উপর। গোমরাহ ও পথ ভ্রষ্ট মানুষকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহ পাক যুগে যুগে লক্ষাধিক নবী (আ:) প্রেরণ করেছেন। এরই পরম্পরায় সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা:)। তাঁর পর আর কোন নবীর আগমন ঘটবে না বিধায় এ মহান দায়িত্ব আপির্ত হয়েছে তাঁর সকল উম্মতের উপর।

এ মহান দায়িত্ব আনজাম দেয়ার লক্ষ্যে মধুপুরের হযরত ১৯৭০ সনে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করে পাকিস্তান সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধারে দীর্ঘ দেড় বছর দাওয়াতের কাজে সময় লাগান। এরপর নিজ এলাকায় ফিরে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মেহনতের এধারা পূর্ণরূপে অব্যাহত রাখেন। বর্তমানে এই বৃদ্ধ বয়সেও দ্বীনের বিভিন্ন মুখী খিদমতে সার্বক্ষনিক ব্যস্ততার মধ্য দিয়েও তাবলীগের নানা প্রোগ্রাম যথাযথ পালন করেন।
তাবলীগের একটি বিশ্বব্যাপী প্রোগ্রাম টঙ্গীর এস্তেমায় একদিন আগ থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত উপস্থিত থাকেন। এ পর্যন্ত বিশ্ব এজতেমা কোন সময় কামাই হয় নাই। ১৪২৭ হি: সনে হজ্জ থেকে ফিরার টিকেট কিছু বিলম্বে ছিল। টিকেট অনুযায়ী আসলে এজতেমা পাবেন না বিধায় বহু টাকা খরচ করে নতুন টিকেট বানিয়ে দেশে আসেন এবং সফরের সীমাহীন পরিশ্রম থাকা সত্বেও বিমান বন্দর হতে সরাসরি টঙ্গী ময়দানে গিয়ে পূর্ণ সময় ময়দানেই কাটান। তাবলীগের মেহনত হযরতের নিকট একটি প্রিয় মেহনত। হযরতের মাদরাসার ছাত্র ও আসাতিযায়ে কিরামগনকে সব সময় এ ব্যাপারে তারগীব দিয়ে থাকেন। এমনকি হযরত কাউকে মুরীদ করলে তরীকতের ছবক প্রদানের সময় তাবলীগী মেহনতের সাথে জোড়ে থাকার বিশেষ অছিয়ত করেন।

মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা:

মধুপুরের হযরত ১৯৭০ সালে লেখা পড়া শেষ করে এক টানা দেড় বছর আল্লাহ্র রাস্তায় সময় লাগানোর পর ছয় মাস কাকরাইলে মুকীম হিসাবে থাকেন। তাবলীগের অনেক মুরব্বীগন কাকরাইলে মুকীম হয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু স্বীয় প্রাণ প্রিয় উস্তাদ ও মুর্শেদ ওলামা বাজারের হযরত লেখা পড়ার শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে মাদ্রাসার খিদমতে লেগে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন । মুর্শিদের পরামর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এলাকায় ফিরে বুলন্দ হিম্মত নিয়ে দক্ষিণ মধুপুর মসজিদ সংলগ্ন মক্তব যেখানে হযরত নিজেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন, সেখানে ব্যাপক প্রোগ্রাম নিয়ে মাদ্রাসা আরম্ভ করলেন। দীর্ঘ চার বছর যাবত মাদ্রাসা সেখানেই ছিল। কিন্তু জায়গার সল্পতা ও তিন পার্শ্বে মানুষের বাড়িঘর আর তাদেরকে সরানো ও মুশকিল ইত্যাদি নানা সমস্যার কারনে স্বীয় পীর ও মুর্শিদের ইশারায় ইছামতি নদীর তীরে প্রশস্ত জায়গায় মাদ্রাসা স্থানান্তর করেন। নতুন জায়গায় মাদ্রাসা স্থাপনের বরকত স্বরূপ মাটির প্রথম মুষ্টি আমীরে শরিয়ত ও তরীকত কুত্বুল আলম হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর হাতে রাখা হয়। এরপর পরবর্তি মুষ্টি রাখা হয় হযরতের নিজের শায়েখ ওলামা বাজারের হযরতের হাতে।

হযরতের স্বীয় মুর্শেদ আঃ হালীম সাহেব (রহ.) এর নামানুসারে অত্র মাদ্রাসার নাম রেখেছেন “জামি’আ ইসলামিয়া হালীমিয়া”। আর সুযোগ্য মুর্শেদের অন্তরে ছিল এর প্রতি গভীর ভালবাসা। সব সময় ইহার জন্য দু’আ করতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতি বছর বার্ষিক মাহফিল এসেছেন। শুধু ১৯৯০ সনে আসেননি। তাও এক বিশেষ কারণে। তা হল আমাদের হযরত ওলামা বাজার গিয়ে মাহ্ফিলের দাওয়াত দিয়েছিলেন কিন্তু ক্ষীন আওয়াজ হওয়ার কারণে স্পষ্ট বুঝেননি বিধায় ঐ তারিখে সিলেটের এক মহা সম্মেলনের দাওয়াত রেখে ছিলেন। এখন মধুপুরের যাতায়াত ব্যবস্থা কিছু ভাল হলেও অল্প কিছুদিন পূর্বে খুবই কষ্টকর ছিল। এতদসত্ত্বেও এই মাদ্রাসায় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ভারত ও পাকিস্তান সহ দেশ-বিদেশের বহু যুগ শ্রেষ্ঠ ওলামায়ে কিরাম ও বযূর্গানে দ্বীনের পদার্পন হয়েছে।

হযরতের খেলাফত লাভ:

দারুল উলূম আল হুসাইনিয়া ওলামা বাজার, ফেনী পড়া-শুনার সময় হতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুগশ্রেষ্ঠ ওলীয়ে কামেল হযরত আব্দুল হালীম সাহেব (রহ.) এর একান্ত আন্তরিকতা, পূর্ণ স্নেহমাখা সান্নিধ্যের মাধ্যমে ইলমে জাহেরীর সাথে সাথে ইলমে বাতেনী তথা আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রশিক্ষণ লাভ এবং কলবকে আওছাফে রাযীলা তথা চারিত্রিক দোষ ত্র“টি দুর করে আওছাফে হামীদা তথা সৎ গুনাবলী অর্জন করতঃ অন্তরকে বেলায়েতে খাচ্ছা বা আল্লাহ্র খাছ ওলী হওয়ার যোগ্য পাত্র বানান। অতঃপর কর্মজীবনের কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর অত্র জামি’আর বার্ষিক মাহফিলে উপস্থিত সকলের সামনে হযরত পীর সাহেব তাঁর শাইখ থেকে খেলাফত প্রাপ্ত হন।

এছাড়াও তাঁকে খেলাফত প্রদান করেন খাতেমুল মুহাদ্দেছীন হযরত আন্ওয়ার শাহ্ কাশ্মীরী (রহ.) এর সুযোগ্য সন্তান হযরত আন্ যার শাহ্ কাশ্মীরী (রহ.)। আরো খেলাফত প্রদান করেছেন হযরতের শশুর হযরত শাহ্ সুলাইমান সাহেব (রহ.)। কিন্তু আমাদের হযরত ওলামা বাজারের হযরতের খলীফা হিসাবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন এবং ওলামা বাজারের হুজুরের বাতানো পদ্ধতিতে মুরীদগনের তরবিয়ত করে থাকেন। খেলাফত লাভের পূর্বে যেমনি ভাবে তাবলীগের নেসবতে মেহনত ও সফর হত, খেলাফত লাভের পরও ঐ রূপ মেহনত চলতে থাকে। এক সময় সিংগাইর এলাকায় কোন এক মাহ্ফিলে শুনলেন যে, মানুষ দলে দলে ভন্ড আটরশি যাচ্ছে। তখন হযরত আফসোস করলেন ও উপস্থিত মানুষের দরখাস্তে সর্ব প্রথম মুরীদ করেন।

হযরতের খেলাফত প্রদান:

এ পর্যন্ত হযরতের তরীকতের মেহ্নতের উসিলায় বহু তরীকত পিপাসু ভক্তবৃন্দ ও মুরীদ মুহিব্বীন দেশ-বিদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। হযরত ওয়ালা তাদের রূহানী তরবীয়তের লক্ষ্যে বিভিন্ন এলাকায় এছ্লাহী মাহ্ফিল করেন। এবং প্রতি আরবী মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার মারকাজী ভাবে মধুপুরেই এছ্লাহী মাহ্ফিলের ব্যবস্থা করেন। এই মেহনত আরো ব্যাপকতার লক্ষ্যে হযরতের নিজ হাতে গড়া প্রাণপ্রিয় ছাত্র প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা আঃ কাদের সাহেব (রহ.) কে খেলাফতও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রিয় ছাত্র ও খলীফা ২০০২ সালে ইন্তেকাল করেন। এরপর ২০১১ সালে হযরত আরো তিন জনকে খেলাফত দিয়েছেন। তারা হলেন:-.১। আলহাজ্ব হযরত মাওলানা হাফেজ মুফতী শহিদুল্লাহ্ উজানভী সাহেব।.২। আলহাজ্ব হযরত মাওলানা মুফতী আবু বকর সাহেব, মুহাদ্দিস ও মুফতী, জামি’আ ইসলামিয়া হালীমিয়া মধুপুর।.৩। আলহাজ্ব হযরত মাওলানা নূরুল হক সাহেব, মুহ্তামিম, ধর্মশুর হামিদিয়া মাদ্রাসা, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা।

পরিশেষে আল্লাহ তা’আলার নিকট আবেদন যেন আল্লাহ পাক হযরতের দীর্ঘ নেক হায়াত দান করেন।.এবং আমাদেরকে হযরত থেকে বেশী বেশী উপকৃত হওয়া তৌফিক দান করেন আমীন ছুম্মা আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *