Thursday , December 9 2021
আশুরার ফজিলত ও আমল

মহররম বা আশুরার ফজিলত ও আমল

আরবি ‘আশারা’ শব্দের অর্থ দশ। আর মাসের দশ তারিখ অর্থে আশুরা। কিন্তু ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে আশুরা বলতে মহররম মাসের দশ তারিখকে বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা হয়। হিজরি সনের মহররম মাসের দশ তারিখে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন কারবালা প্রান্তরে শহিদ হন। এই কারণে মুসলমানরা যে শোক দিবস পালন করে থাকেন তাকে আশুরা বলে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছেও এ দিনটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এরা মর্সিয়া ও মাতমের মাধ্যমে এই দিনটি উদযাপন করে। মুসলমানদের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই দিনটি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকে।

ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর মধ্যে আশুরা অনন্য। হিজরি সনের সূচনা হয় মহররম মাসের মাধ্যমে। ‘মহররম’ শব্দের অর্থ পবিত্রতম ও মর্যাদাপূর্ণ। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে এ মাসকে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের চোখে দেখা হতো। এর পবিত্রতা ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করেই যুদ্ধপ্রিয় আরবরা এ মাসে সব ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে বিরত থাকতো। হাদিস শরিফে এ মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ মাস সম্পর্কে পবিত্র কুরআনেে বর্ণিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২ টি। এর মধ্যে ৪ টি নিষিদ্ধ ও সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং, এসব মাসে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না (সূরাঃ তাওবা, আয়াতঃ ৩৬)।”

ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, এই দিনে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে আল্লাহ নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন। এই দিন হযরত মুসা (আঃ) এর শত্রু ফেরউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। হযরত নূহ (আঃ) জাহাজ ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন এবং তিনি জুডি পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এই দিনে হযরত দাউদ (আঃ) এর তাওবা কবুল হয়েছিল; নমরূদের অগ্নিকান্ড থেকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) উদ্ধার পেয়েছিলেন; হযরত আইয়ুব (আঃ) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন। এই দিনে মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আঃ) কে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। আবার, প্রচলিত আছে যে, এই দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।

আশুরার দিনটি মুসলিম বিশ্বের কাছে গভীর শোক ও বেদনার দিন। এই দিনে আমল হিসেবে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত রোজা রাখা। আশুরা উপলক্ষে দুই দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মহররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। ইসলামে আশুরার রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন, অন্য কোন রোজা সম্পর্কে রাসূল(সাঃ) কে সেরূপ গুরুত্ব দিতে দেখিনি। (সহিহ বুখারীঃ ২০০৬ ; মুসলিমঃ ১১৩২)। হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন, রমজানের পরে সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা অর্থাৎ আশুরার রোজা। আর ফরজ সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত (আবু দাউদঃ২৪১১)। রাসূল(সাঃ) আরও বলেন, আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ তায়ালা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন ( সুনানে তিরমিজিঃ ৭৫২)।

আশুরার দিনে আরেকটি আমল হলো খাবারে যথাসাধ্য উদারতা প্রদর্শন করা। হযরত জাবের(রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার নিজের ও পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ তায়ালা সারা বছর তার রিজিকের প্রশস্ততা দান করবেন। এই দিনে আরেকটি আমল হলো, নবীর পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া করা, দুরুদ পড়া এবং তাদের কাছে থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে আশুরার এই আমলগুলো করার মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *