Logo

নেইমারদের হারিয়ে লিল যেভাবে ফ্রেঞ্চ রুপকথা তৈরি করলো

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১
নেইমারদের হারিয়ে লিল যেভাবে ফ্রেঞ্চ রুপকথা তৈরি করলো

কাতারি ধনকুবের নাসের আল খেলাইফি বিগত এক দশকে ফেঞ্চ ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেছেন। কিনে এনেছেন ইউরোপের সেরা সেরা ফুটবলার। টাকার উপর ভর করে বিগত দশ মৌসুমে লিগ ওয়ান জিতেছেন সাত বার। এর মধ্যে ছেদ পড়েছে তিনবার ।2011-12 মৌসুমে ম্যপিলিয়ার, 2015-16 মৌসুমে মোনাকো আর চলতি মৌসুম 2020-21 লিল অলিম্পিকি স্পোর্টিং ক্লাব।

পুঁচকে লিল নেইমার,এমবাপ্পে,ডি মারিয়াদের নিয়ে গঠন করা পিএসজিকে হারিয়ে চলতি মৌসুমে লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।লিলের ইতিহাসে এটা চতুর্থ শিরোপা,এই দশকে প্রথম।মাত্র পয়েন্টের ব্যাবধান, পুরো মৌসুমে মাত্র তিনটি ম্যাচে পরাজয়;সব কিছু মিলিয়ে ফ্রেঞ্চ ফুটবলে এক রুপকথার জন্ম দিয়েছে লিল ।

লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি তাদের শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে লিগ শুরু করেছিলো এবং সবাই ধরে রেখেছিলো মৌসুম শেষে তাদের হাতেই থাকবে লিগ ওয়ান শিরোপা। কিন্তু তাদের কপালে লাথি দিয়ে পুঁচকে লিল, লিগ ওয়ান শিরোপা কেড়ে নিলো। আর লিল এটা করলো পিএসজির চার ভাগের এক ভাগ বাজেট নিয়ে।

লিলকে এই অসাধ্য সাধন করতে নানা প্রতিবন্ধকতা মোকবেলা করতে হয়েছে। তাদের অখ্যাত কোচ ক্রিস্টোপ গ্লাটার।যিনি প্রতিপক্ষ দলগুলোর কোচদের তুলনায় অনেক কম অভিজ্ঞ ও কম পরিচিত মুখ।তাকে নিয়েও লিলের খুব একটা ভরসা ছিলো না। মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে ছিলো মৌসুমের মাঝামাঝিতে ক্লাবের মালিকানা পারিবর্তনের ঢেউ।

কিন্তু সব হিসেব-নিকেষ উল্টে দিয়ে নেইমার, এমবাপ্প,ডি মারিয়াদের হতাশ করে লিগ ওয়ান শিরোপা উঁচু করে ধরতে সক্ষম হয়েছে ক্রিস্টোপ গ্লাটারের শিষ্যরা।

পি এস জি র দৈণ্যদশা ও অস্তিরতা

টমাস টুখেল যিনি এখন ইংলিশ ক্লাব চেলসির কোচ;বারো মাস আগে তিনি পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন।কিন্তু লীগ শুরুর ছয় মাস পরেই বরখাস্ত হোন পি এস জির পরিচালক লিওনার্দোর সাথে বনিবনা না হওয়ায়।তার দল এই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতেছে। ।লন্ডনে বসে তিনি হয়ত আশা করেছিলেন তার সাবেক ক্লাবটি অন্তত লিগ ওয়ান শিরোপাটি জিতবে কিন্তু লিল টমাস টুখেল ও পি এস জির স্বপ্ন ভঙ্গ করে দেয়।

থমাস টুখেলকে বরখাস্ত করে পিএসজি নিয়োগ দিয়েছে আর্জেন্টাইন কোচ মারিসিও পাচিত্তিনোকে। মারিসিও অবশ্য পুনরায় পিএসজিকে অন্যতম সেরা ক্লাবের কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এই মৌসুমে শুধু মাত্র ফেঞ্চ কাপ জিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাকে।

করেোনা ভাইরাস পেনডেমিকের কারনে ইউরোপের অন্য সব ক্লাবগুলো যেখানে অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে সেখানে পিএসজি,ম্যানসিস্টার সিটি,চেলসির মত ধনকুবের মালিকদের দলগুলো নতুন খেলোয়ার দলে ভেরানো, ইচ্ছামত কোচ আনায় পিছিয়ে ছিলো না। সেক্ষেত্রে পিএসজি দল শক্তিশালী করনে কোন ভাবেই পিছিয়ে ছিল না।

তাদের দলে আছেন বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলার নেইমার জুনিয়র, বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে। গোলকিপার হিসেবে আছেন কেইলর নাভাস;যিনি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতেছেন। আনহেল ডি মারিয়া, মার্কো ভেরাত্তি, মার্কোইনহোসের মত বড় বড় তারকা ফুটবলার। তবু তারা লিলের সাথে পেড়ে উঠতে পারেনি।

পি এস জির একাডেমি সাহায্য করলো লিলকে

লিল ও পিএসজির খেলোয়ারদের দামের পার্থক্য আকাশ পাতাল। পুরো লিল স্কোয়াড মার্কেট 147 মিলিয়ন ইউরো অন্যদিকে পিএসজির স্কোয়াড মার্কেট প্রাইস 640 মিলিয়ন ইউরো। টাকার কাছে লিল পিএসজির একদম ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া আরো একটি মজার কারন কাজ করেছে যা একটু হলেও হাস্যকর ও পিএসজির জন্য বেদনাদায়ক। পিএসজিরই চারজন একাডেমি খেলোয়ার যারা বর্তমানে লিলে খেলছেন এবং লিলকে লিগ ওয়ান জিততে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন।

গোলকিপার মাইক মিগনান,মিডফিল্ডার বুবাকি সুমার আর স্ট্রাইকার টিমোথি ইয়াহ্ ও জোনাথন ইকন;সাবেক পিএসজি খেলোয়ার যারা তাদের সাবেক ক্লাবের বুকে ছুড়ি মেরেছেন।পুরো মৌসুম জুড়েই মিগনান গোলবারের নিচে অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

সেন্টার ব্যাক জস ফন্টের বয়স সাঁইত্রিশ।তিনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের দল ক্রিস্টাল প্যালেস,সাউদাম্পটন ও ওয়েস্ট হ্যামেও খেলেছেন। অপর সেন্টারব্যাক সেভন বোটম্যানের সাথে এক অসাধারন জুটি গড়েন। লিলের রক্ষণকে দূর্গে পরিনত করেন তারা। যা ভেদ করা প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের জন্য প্রায় দুষ্কর ছিলো।

আক্রমন ভাগে দারুন সাফল্য দেখিয়েছেন বুরাক ইয়ালমিজ।পঁয়ত্রিশ বছর বয়স্ক বুরাক ইয়ালমিজ এর পূর্বে তার নিজ দেশ তুরস্কের বাইরে ইউরোপে কোন ক্লাবে খেলেননি। চলতি লিগ ওয়ানে তিনি 16 গোল করেছেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইয়ালমিজ। মৌসুমের শেষ ম্যাচেও শিরোপা নির্ধারণী গোলটি আসে ইয়ালমিজের পা থেকে।

বুরাক ইয়ালমিজ জুটি গড়েন তরুন কানাডিয়ান জোনাথন ডেভিডের সাথে। জোনাথন চলতি মৌসুমে বেলজিয়ান ক্লাব জেন্ট থেকে লিলে যোগ দিয়েছেন। ইয়ালমিজের অভিজ্ঞতা আর জোনাথনের তারুণ্য লিলের আক্রমন ভাগকে আরো ধাঁরালো করেছিলো। জোনাথনের করা 13 গোল ছিলো তেরোটা সোনার ডিম।

পর্তুগীজ মিডফিল্ডার রেনাটো সানজেচ ছিলেন চলতি মৌসুমে লিলের মধ্যমাঠের প্রাণভোমরা। সানজেচ বয়সে তরুন হলেও ইতিমধ্যেই বেনফিকাতে তার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। বায়র্ন মিউনিখে থিতু হতে না পারলেও লিলে এসে আবার তার পুরোনো ফর্ম ফিরে পেয়েছেন। আর তার ফর্ম লিলের জন্য নিয়ে এসেছে লিগ ওয়ান শিরোপা।

লিল পুরো মৌসুম জুড়ে 21 জন খেলোয়াড় ব্যাবহার করেছে যা লিগের অন্য দলগুলোর তুলনায় কম। লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের গ্রপ পর্ব নিশ্চিত করেছে। যার পুরো কৃতিত্ব কোচ ক্রিস্টোপ গ্লাটার ও তার শিষ্যদের।

এত কম বাজেট,অখ্যাত কোচ আর প্রতিপক্ষের তুলনায় খেলোয়ারদের নিয়ে লিল যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে তা ফ্রেঞ্চ ফুটবলে রুপকথাকেও হার মানায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন


এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Theme Created By Tarunkantho.Com